দালালের বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ, দ্রুত মরদেহ ফেরত চায় স্বজনেরা
মাছুম বিল্লাহ জাফর, বরগুনা প্রতিনিধি:
পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন বরগুনার তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের নলবুনিয়া গ্রামের আবু হানিফ। স্বপ্ন ছিল স্ত্রী, দুই সন্তান ও মাকে ভালো রাখার। কিন্তু ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর সৌদি আরবে তাঁর মৃত্যুতে সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে। এখন অর্থসংকট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জটিলতায় তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে পরিবার। বাবার মরদেহের অপেক্ষায় দিন কাটছে ১০ বছর বয়সী ছেলে জুনায়েদ ও পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে সামিরার। অন্যদিকে, স্বামীকে হারিয়ে দিশেহারা স্ত্রী মোসাম্মৎ কাজল (২৫) এবং ছেলেকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন তাঁর মা।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ এবং পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার আশায় সৌদি আরবে গিয়েছিলেন আবু হানিফ। কিন্তু তাঁর মৃত্যুতে স্ত্রী, সন্তান ও মায়ের জীবনে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা। পরিবারের দাবি, বিদেশে পাঠানো এবং পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করে দেওয়ার কথা বলে দুই ব্যক্তিকে মোট ১০ লাখ টাকা দেওয়া হলেও আবু হানিফ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাননি।
সৌদি পাঠানোর নামে ১০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ
আবু হানিফের স্ত্রী মোসাম্মৎ কাজল গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, তাঁর স্বামীকে সৌদি আরবে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন তালতলী উপজেলার আলীর বন্দর গ্রামের আবদুল খালেকের ছেলে আনোয়ার (৫০) এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার পাখিমারা এলাকার দৌলতপুর গ্রামের আবদুল ওয়াদুদ শিকদার।
কাজলের অভিযোগ, ২০২৩ সালে তাঁর স্বামীকে সৌদি আরবে পাঠানোর জন্য ওই দুই ব্যক্তিকে প্রথমে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। তবে টাকা নেওয়ার পরও তাঁর স্বামীর হাতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তুলে দেওয়া হয়নি। তাঁকে তাঁদের পরিচিত একটি কোম্পানিতে কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় তিনি সৌদি আরবে অনিশ্চিত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিলেন বলে দাবি করেন কাজল।
তিনি আরও জানান, ২০২৬ সালে তাঁর স্বামীর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করে দেওয়ার কথা বলে ওই দুই ব্যক্তি আরও ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। স্বামীর কাগজপত্র তৈরি হবে—এমন আশায় বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে ধারদেনা করে তিনি ওই টাকা সংগ্রহ করেন। পরে সম্পূর্ণ ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিকাশের মাধ্যমে পাঠানো হয় বলে জানান তিনি।
কাজলের দাবি, দুই দফায় মোট ১০ লাখ টাকা দেওয়ার পরও তাঁর স্বামীর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করে দেওয়া হয়নি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে কাজল বলেন, “আমার স্বামীকে যখন প্রথম সৌদি আরবে পাঠানো হয়, তখন ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়েছি। তারা আমার স্বামীর হাতে কোনো কাগজপত্র দেননি। পরে কাগজপত্র করে দেওয়ার কথা বলে আরও ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা চায়। মানুষের কাছ থেকে ধারদেনা করে পুরো টাকাটা বিকাশের মাধ্যমে পাঠিয়েছি। কিন্তু টাকা নেওয়ার পরও তারা কাগজপত্র করে দেয়নি। আমার স্বামীর কাগজপত্র থাকলে হয়তো আজ আমাদের এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না।”
পরিবারের দাবি, আবু হানিফের ভিসা, আকামা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জটিলতার কারণে তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও লেনদেনের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
একই দালালের মাধ্যমে ছেলেকে সৌদি পাঠিয়েছেন সাবেক ইউপি সদস্য
টাকার লেনদেনের বিষয়ে নলবুনিয়া গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য আলমগীর হাওলাদার বলেন, তিনি এ বিষয়ে সবকিছু জানেন। একই দালালের মাধ্যমে তিনিও নিজের ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছেন। তাঁর ছেলেও একই ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
আলমগীর হাওলাদার বলেন, “এটা টাকার লেনদেনের বিষয়। আমি সবই জানি। এই দালালের মাধ্যমে আমার ছেলেকেও বিদেশে পাঠিয়েছি। আমার ছেলেরও একই অবস্থা। জানি না, আমাদের কপালে কী আছে।”
তাঁর এ বক্তব্যে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য অর্থ লেনদেন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে তাঁর ছেলের পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট লেনদেনের বিস্তারিত তথ্যও যাচাই করা প্রয়োজন।
ঋণের বোঝায় দিশেহারা পরিবার
আবু হানিফকে বিদেশে পাঠানো ও পরবর্তী সময়ে কাগজপত্র তৈরি করানোর জন্য অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে পরিবারটি ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, বিভিন্ন এনজিও এবং ব্যক্তিগতভাবে ধারদেনা করে অর্থ সংগ্রহের কারণে পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ বেড়েছে।
একদিকে স্বামীর মৃত্যুর শোক, অন্যদিকে ঋণের বোঝা এবং মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কাজল।
স্বামীকে হারিয়ে তিনি বলেন, “আমার স্বামীর লাশটা অন্তত তার নিজের ভিটায় ফিরিয়ে দেওয়া হোক। আমার সন্তানরা যেন বাবার কবরটা দেখতে পারে। আত্মীয়-স্বজনরাও যেন শেষবারের মতো তাকে দেখতে পারেন।”
অন্যদিকে, ছেলেকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন আবু হানিফের মা। জীবিত ছেলেকে আর ফিরে পাওয়ার আশা নেই তাঁর। এখন তাঁর শেষ ইচ্ছা, ছেলের মরদেহটি দেশে এনে নিজ বাড়িতে দাফন করা।
মরদেহ ফিরিয়ে আনতে সরকারি সহযোগিতার দাবি
আবু হানিফের পরিবারের এই দুর্দশার কথা জানিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। একই সঙ্গে ঋণের বোঝায় জর্জরিত পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনীয় আর্থিক ও প্রশাসনিক সহযোগিতা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
পরিবারের প্রত্যাশা, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর এবং সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাস মানবিক দিক বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে। একই সঙ্গে বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে অর্থ নেওয়া এবং কাগজপত্র তৈরি না করার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্বজনেরা।
দ্রুত প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন করে আবু হানিফের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হলে স্বজনেরা শেষবারের মতো প্রিয় মানুষটিকে বিদায় জানানোর সুযোগ পাবেন। দুই শিশু জুনায়েদ ও সামিরাও বাবার কবরের পাশে দাঁড়ান