হাকিকুল ইসলাম খোকন
এমডি নাসির হেলাল মাহমুদ, বাপসনিউজঃ মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারির দাফন নিয়ে লংকান্ডের এবং শিখা অনির্বাণ নিভিয়ে ফেলার প্রতিবাদে নিউইয়র্কে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।খবর আইবিএননিউজ ও বাপসনিউজ।ঢাকা সেনানিবাসের `শিখা অনির্বাণ’ -এ চিরজ্বলন্ত শিখাটি নিভিয়ে ফেলার প্রতিবাদ এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রজ্বলিত রাখার দাবি ও পিরোজপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা মাণিক পশারির দাফন নিয়ে সৃষ্ট লজ্জাস্কর ও ঘৃণ্য পরিস্থিতির প্রতিবাদে গত ৩০ অক্টোবর ২০২৬,শুক্রবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্ক সিটির জ্যাকসন হাইটসে নবান্ন পার্টি সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। জেনোসাইড’৭১ ফাউন্ডেশন ইউএসএ”র আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনের সঞ্চালনা ও পরিচালনায় ছিলেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ও যুক্তরাষ্ট্র শ্রমিক লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও পূর্বাঞ্চলীয় আওয়ামী লীগ নেতা মনজুর চৌধুরী।মন্তে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সভাপতি ও যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের অন্যতম উপদেষ্টা বাকসু”র সাবেক জিএস এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা ড.প্রদিপ রজ্ঞন কর,যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ ও সংগঠনের অন্যতম উপদেষ্টা ও সিনিয়র সাংবাদিক এবং লায়ন হাকিকুল ইসলাম খোকন,যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ও পূর্বাঞ্চলীয় আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মাদ আলী সিদ্দিকী,বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কলামিস্ট এবং অথর মকবুল হোসেন তালুকদার,বীর মুক্তিযোদ্ধা শওকত আকবর রীতি,বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কলামিস্ট খুরশিদ আনোয়ার বাবলু,বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক হোসাইন,কক্ষপথ “৭১ যুক্তরাষ্ট্র এর সভাপতি এডভোকেট জাকির এইচ মিয়া,আওয়ামী লীগ নেএী রিনা আবেদীন,কৃষিবিদ ও আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ মিজানুর রহমান,আওয়ামী লীগ নেতা কাজল মাহমুদ,যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী সেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সভাপতি নুরুজ্জামান সরকার,যুক্তরাষ্ট্র শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল আহমেদ,সহ-সভাপতি টি.মোল্লা,যুক্তরাষ্ট্র যুবলীগ নেতা শফিকুল ইসলাম,যুক্তরাষ্ট্র ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জয়নাল আবেদীন জয়,সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর এইচ মিয়া,কমিউনিটি এক্টিভিস্ট শক্তি দাস গুপ্ত ও বীজ মুক্তিযুদ্ধার সন্তান শিবলী সাদেক প্রমুখ ।
সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্যে জেনোসাইড’৭১ ফাউন্ডেশন ইউএসএ সভাপতি ও যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের অন্যতম উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. প্রদীপ রজ্ঞন কর উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে শিখা অনির্বাণ' এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। এটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সাহস, ত্যাগ ও দেশপ্রেমের স্মারক। কোটি বাংলাদেশির কাছে এটি কেবল সামরিক আত্মত্যাগের প্রতীকই নয়, বরং স্বাধীনতা, মর্যাদা, গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের জন্য জাতির সংগ্রামেরও এক অবিস্মরণীয় প্রতীক। চিরজ্বলন্ত শিখা’ বিশ্বজুড়ে এমন একটি প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত, যা একটি জাতির অশেষ কৃতজ্ঞতাবোধকে তুলে ধরে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের শিখা নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রজ্বলিত রাখা হয়, কারণ এগুলো জাতির জন্য জীবন উৎসর্গকারীদের স্মরণে রাখা এক চিরস্থায়ী অঙ্গীকারের বহিঃপ্রকাশ।’ লিখিত বক্তব্যে গভীর উদ্বেগের সাথে বলা হয়, `আমরা অবগত হয়েছি যে, ঐ চিরজ্বলন্ত শিখাটির প্রজ্বলন বন্ধ রাখা হয়েছে। শিখা অনির্বাণ’-এর প্রতীকী গুরুত্ব বিবেচনায় এর নিরবচ্ছিন্ন প্রজ্বলন বজায় রাখা অত্যন্ত যৌক্তিক। একটি আনুষ্ঠানিক চিরজ্বলন্ত শিখা বজায় রাখার ব্যয় এর শিক্ষামূলক, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও জাতীয় তাৎপর্যের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী, সামরিক সদস্য, প্রবীণ সেনাসদস্য, কূটনীতিক, গবেষক এবং সাধারণ নাগরিক বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য প্রদত্ত আত্মত্যাগের কথা জানতে জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভগুলো পরিদর্শন করেন। নিরন্তর প্রজ্বলিত এই শিখাটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি জীবন্ত শিক্ষা হিসেবে কাজ করে|
এতদসত্বেও জ্বালানি সাশ্রয়ের সরকারি কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজধানীর ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধের স্মারক `শিখা অনির্বাণ’ আপাতত সার্বক্ষণিকভাবে জ্বালিয়ে না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়েছে, সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় একটি জঙ্গিগোষ্ঠি এর আগে প্রকাশ্য দিবালোকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক স্থাপনা গুড়িয়ে দিয়েছে। সেই সেনাবাহিনী জ্বালানী সাশ্রয়ের অজুহাতে শিখা অনির্বাণ নিভিয়ে ফেলার অজুহাত দাঁড় করিয়ে পুরো জাতির সাথে তামশা করেছে। এর বিপরীতে জেনোসাইড একাত্তর ফাউন্ডেশন যুক্তরাষ্ট্র জানায় যে, শিখা অনির্বাণ প্রজ্জ্বলিতভাবে জ্বালিয়ে রাখার স্বার্থে প্রবাস থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ সরবরাহ করা হবে, তবুও যেন তা জ্বালিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
এরপরই বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারির লাশের প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মান ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনে ক্ষমতাসীনদের মদদে প্রচন্ডভাবে বাধা প্রদানের তীব্র সমালোচনা করেন `জেনোসাইড’৭১ ফাউন্ডেশন যুক্তরাষ্ট্র মঞ্জুর চৌধুরী। এহেন আচরণের নিন্দা এবং ইস্যুটিকে একাত্তরের বর্বরতা-হিংস্রতার পরিপূরক হিসেবে অভিহিত করে প্রবাসের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিতদের নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে দেন-দরবারের ঘোষণা দেয়া হয় ।তিনি লিখিত বক্তব্যে আরো বলেন,ঢাকা সেনানিবাসের ‘শিখা অনির্বাণ’-এ চিরজ্বলন্ত শিখাটির স্থায়ী পুনরুদ্ধার ও নিরবচ্ছিন্ন প্রজ্বলন বজায় রাখার দাবীতে-
সংবাদ সন্মেলন
উপস্থিত সন্মানীত সাংবাদিক বন্ধুদগণ,
‘জেনোসাইড ’৭১ ফাউন্ডেশন, ইউএসএ’ (Genocide ’71 Foundation, USA)—যা ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের জেনোসাইড (গণহত্যা) ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণে নিবেদিত একটি অলাভজনক মানবাধিকার ও ঐতিহাসিক স্মৃতি সংরক্ষণমূলক সংস্থা—এর পক্ষ থেকে আমরা ঢাকা সেনানিবাসের ‘শিখা অনির্বাণ’-এর চিরজ্বলন্ত শিখাটির বিষয়ে একটি দাবী পেশ করছি।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘শিখা অনির্বাণ’ এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। এটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সাহস, ত্যাগ ও দেশপ্রেমের স্মারক। লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশির কাছে এটি কেবল সামরিক আত্মত্যাগের প্রতীকই নয়, বরং স্বাধীনতা, মর্যাদা, গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের জন্য জাতির সংগ্রামেরও এক অবিস্মরণীয় প্রতীক।
‘চিরজ্বলন্ত শিখা’ বিশ্বজুড়ে এমন একটি প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত, যা একটি জাতির অশেষ কৃতজ্ঞতাবোধকে তুলে ধরে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের শিখা নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রজ্বলিত রাখা হয়, কারণ এগুলো জাতির জন্য জীবন উৎসর্গকারীদের স্মরণে রাখা এক চিরস্থায়ী অঙ্গীকারের বহিঃপ্রকাশ।
আমরা অবগত হয়েছি যে, ঐ ‘চিরজ্বলন্ত শিখাটির’ প্রজ্বলন বন্ধ রাখা হয়েছে। ‘শিখা অনির্বাণ’-এর প্রতীকী গুরুত্ব বিবেচনায় এর নিরবচ্ছিন্ন প্রজ্বলন বজায় রাখা অত্যন্ত যৌক্তিক।
একটি আনুষ্ঠানিক চিরজ্বলন্ত শিখা বজায় রাখার ব্যয় এর শিক্ষামূলক, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও জাতীয় তাৎপর্যের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী, সামরিক সদস্য, প্রবীণ সেনাসদস্য, কূটনীতিক, গবেষক এবং সাধারণ নাগরিক বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য প্রদত্ত আত্মত্যাগের কথা জানতে জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভগুলো পরিদর্শন করেন। নিরন্তর প্রজ্বলিত এই শিখাটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি জীবন্ত শিক্ষা হিসেবে কাজ করে।
‘জেনোসাইড ’৭১ ফাউন্ডেশন, ইউএসএ’ কোনো রাজনৈতিক সুবিধা বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রত্যাশা করে না। আমাদের লক্ষ্য হলো—ঐতিহাসিক সত্যকে সমুন্নত রাখা, জেনোসাইড বা গণহত্যায় নিহত ব্যক্তি ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষিত করে তোলা এবং সর্বজনীন মানবাধিকারের প্রসার ঘটানো।
আমাদের সংগঠনের এই লক্ষ্যে সামনে রেখে, আমরা আমাদের সংস্থার পক্ষ থেকে সহায়তার প্রস্তাব দিচ্ছি য যদি আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে ‘শিখা অনির্বাণ’-এর নিরবচ্ছিন্ন প্রজ্বলন বজায় রাখা সত্যিই কঠিন হয়ে পড়ে, তবে ‘জেনোসাইড ’৭১ ফাউন্ডেশন, ইউএসএ’ এ ক্ষেত্রে আর্থিক অনুদান রাখতে অথবা তহবিল সংগ্রহের কাজে সহায়তা করতে প্রস্তুত রয়েছে, যাতে জাতীয় এই প্রতীকটি স্থায়ীভাবে প্রজ্বলিত রাখা সম্ভব হয়। এই প্রস্তাবটি কেবল তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবশত উত্থাপন করা হয়েছে, যারা বাংলাদেশের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন; পাশাপাশি এটি জাতির ঐতিহাসিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্দেশ্য থেকেও করা হয়েছে বলে আমরা মনে করি।
সন্মানীত সাংবাদিক বন্ধুগণ,
আমরা বাংলাদেশ সরকার, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের কাছে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি যে:
‘শিখা অনির্বাণ’-এ চিরন্তন শিখাটি পুনরায় প্রজ্বলিত করা হোক।
এটি যেন সর্বদা প্রজ্বলিত থাকে, তা নিশ্চিত করা হোক।
এই চিরন্তন শিখাকে একটি সংরক্ষিত জাতীয় প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হোক—যার নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতি মুক্তিযুদ্ধ শহীদদের প্রতি জাতির চিরস্থায়ী কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাবে।
এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি বিবেচনা করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে কোনো অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক জটিলতা এর প্রতীকী কার্যক্রমকে ব্যাহত করতে না পারে।
ইতিহাস সেই জাতিকেই মনে রাখে, যারা তাদের বীরদের সম্মান জানায়। আমরা বিশ্বাস করি, ১৯৭১ সালের আত্মত্যাগ যে এই জাতির চেতনায় চিরকাল জীবন্ত হয়ে থাকবে, বাংলাদেশ তা প্রদর্শন অব্যাহত রাখবে।উপস্তিত সবাইকে
ধন্যবাদ। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মনজুর চৌধুরী বলেন,জেনোসাইড ’৭১ ফাউন্ডেশন, ইউএসএ।।
সংবাদ সন্মেলন
সুধী সাংবাদিক বন্ধুগণ,
বাংলাদেশে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন নিয়ে সৃষ্ট লজ্জাসকর ও ঘন্য পরিস্থিতির প্রতিবাদে আজকের সংবাদ সম্মেলন-
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসে বীর মুক্তিযোদ্ধারা চিরস্মরণীয়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে যাঁরা লড়াই করেছিলেন, তাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়েই আমরা পেয়েছি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। তাঁদের সাহস, ত্যাগ ও অবদান জাতির গর্ব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা।
মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান জানানো কেবল আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের জাতীয় ইতিহাস, আত্মপরিচয় ও কৃতজ্ঞতাবোধের অংশ। একজন মুক্তিযোদ্ধার জীবদ্দশায় তাঁর যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মৃত্যুর পরও সম্মানজনক শেষবিদায়ের পরিবেশ বজায় রাখা রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। অথচ সারাদেশে দিনের পর দিন মুক্তিযোদ্ধারা নিগৃত ও অপমানিত হচ্ছে।
কিন্তু পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তাঁর গার্ড অব অনার ও দাফন নিয়ে যে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে, তা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—রাজনৈতিক মতপার্থক্য কি মানুষের শেষবিদায়কেও বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে যাবে?
সম্মানীত সাংবাদিক বন্ধুগণ,
সম্প্রতি পিরোজপুরে কী ঘটেছিল?
গত ২৪ অক্টোবর ২০২৬, শনিবার, ৮৭ বছর বয়সের বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী মারা যান। তিনি প্রয়াত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বাদী ও সাক্ষী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি সরকারি গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর মরদেহে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন এবং নিজ এলাকায় দাফনকে কেন্দ্র করে পিরোজপুরে উত্তেজনা দেখা দেয়।
পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক মানিক পশারীকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ বলে দাবি করেন এবং তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়ার বিরোধিতা করেন বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে, তাঁর পরিবারের সদস্যরা তাঁকে সরকারি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
উপস্থিত সাংবাদিক বৃন্দ,
মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নির্ধারণ করবে কে?
মানিক পশারী প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কি না, সে বিষয়ে কারও প্রশ্ন থাকলে তা যাচাই করার নির্ধারিত প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়া রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি পরীক্ষা, কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত এবং প্রযোজ্য আইন অনুসরণ করেই এ ধরনের প্রশ্নের নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।
কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠন নিজেরাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়ে একজন ব্যক্তির মর্যাদা নির্ধারণ করতে পারে না। বিশেষত, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা মৃত্যুবরণ করার পর তাঁর মরদেহকে কেন্দ্র করে বিরোধ সৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। অভিযোগ যাচাইয়ের অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং পরিবারের প্রতি মানবিক আচরণ নিশ্চিত করাও জরুরি।
সন্মানীত সাংবাদিকবন্ধুগণ,
একাত্তরের ইতিহাসকে রাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে রাখা জরুরি-
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি। সেই যুদ্ধের ইতিহাসে মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান, সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ এবং পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের হাতে সংঘটিত নির্যাতনের ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
২০২৪ সালের তথাকথিত গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তবে ভিন্ন সময়ের আন্দোলন ও ঐতিহাসিক ঘটনাকে তুলনা করতে গেলে তাদের প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য, পরিণতি এবং ঐতিহাসিক ভূমিকা পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একটির গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে অন্যটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য অস্বীকার করা কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক আলোচনার পথ নয়।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার হাতিয়ার না বানিয়ে প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত এমন বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড এড়িয়ে চলা, যা সামাজিক বিভাজন বাড়ায় কিংবা জাতীয় ইতিহাস নিয়ে অপ্রয়োজনীয় সংঘাত তৈরি করে।
মৃত্যুর পর শেষ বিদায়েও কি রাজনীতি থাকবে?
বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে কারও মৃত্যু হলে প্রতিবেশী ও স্বজনেরা সাধারণত জানাজা, কবর খনন এবং দাফনের কাজে সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসেন। এটি আমাদের সামাজিক সংহতি ও মানবিক ঐতিহ্যের পরিচয়।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতি তাই মানুষের মনে গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু একজন মৃত ব্যক্তির শেষকৃত্য সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে মানবিকতা, শালীনতা ও পরিবারের মর্যাদা রক্ষা করা কি সবার দায়িত্ব নয়?
ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের অন্যতম শিক্ষা হলো শোকাহত পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা দেখানো। কারও রাজনৈতিক পরিচয়, অতীতের ভূমিকা কিংবা মতাদর্শ নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের সঙ্গে মানবিক আচরণ করা উচিত এটাই আমাদের সমাজের রীতি। কোনো অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে উত্থাপন করতে হবে; মরদেহকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি করা কোনোভাবেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়।তা করাও উচিৎ নয়।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর পরিবারের অভিযোগ, সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে তাঁর মরদেহ নেওয়ার পর গার্ড অব অনার প্রদান এবং নিজ গ্রামে দাফনের বিষয়ে স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের আপত্তি ও বাধার মুখে পড়তে হয় তাঁদের। সারা বাংলাদেশে বিভিন্ন স্থানে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা, নিযাতন ও চরম অত্যাচার বেড়েই চলছে।আমরা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং আমরা বিচারবিভাগীয় তদন্তের দোষীদের সনাক্ত করে দৃস্টান্তমুলক শাস্তির জোড় দাবী জানাচ্ছি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যেন কোনো মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় সম্মান, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কিংবা দাফন নিয়ে অনুরূপ পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে জন্য প্রশাসনের সুস্পষ্ট প্রস্তুতি থাকা দরকার।
রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বেরও দায়িত্ব রয়েছে স্থানীয় পর্যায়ে নেতাকর্মীদের সংযত রাখা, অভিযোগের আইনসম্মত নিষ্পত্তিকে সমর্থন করা এবং উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে শান্তি বজায় রাখতে ভূমিকা নেওয়া।
মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান রক্ষায় জাতীয় অঙ্গীকার
বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর শেষবিদায়ের ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতার ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা শুধু বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। রাষ্ট্রীয় সম্মান, প্রশাসনিক দায়িত্ব, আইনগত প্রক্রিয়া এবং সামাজিক মানবিকতার মধ্য দিয়েই সেই শ্রদ্ধার বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ স্বীকৃতি নিশ্চিত করা, তাঁদের পরিবারকে মর্যাদা দেওয়া, ঐতিহাসিক নথি সংরক্ষণ করা এবং নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের নির্ভরযোগ্য ইতিহাস জানানো আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু সেই মতপার্থক্য যেন মানুষের মর্যাদা, শোকাহত পরিবারের অধিকার এবং জাতীয় ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধাকে ছাপিয়ে না যায়।
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষবিদায় যেন কখনো রাজনৈতিক সংঘাতের উপলক্ষ না হয়—এটাই হওয়া উচিত এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্জন। মুক্তিযোদ্ধারা জাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের কোনোভাবে অপমান করা যাবে না। যদি এদের মধ্যে কেউ কোনো অন্যায় করে থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়াও সংগত। কিন্তু ‘মবে’র নামে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করা, মুক্তিযোদ্ধাদের হেনস্তা করা, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তির বর্তমান কার্যক্রম হয়ে দাঁড়িয়েছে।এটা দেশের কোনো বিবেকবান মানুষ মেনে নিতে পারে না।উপস্থিত সবাইকে
ধন্যবাদ ।সংবাদ সম্মেলন শেষে সবাইকে নৈশভোজে ভোজে আপ্যায়ন করা হয়।