
যুদ্ধাপরাধীর বাবার নামে কলেজের নাম পরিবর্তন হলেও
যুদ্ধাপরাধী সৈয়দ কায়সারের নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো বহাল
হবিগঞ্জ প্রতিনিধি:: দেশে এখনো যুদ্ধাপরাধীর বিচার চলছে। অনেক যুদ্ধাপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড ও আমৃত্যু কারাবাস দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আদালত। যুদ্ধাপরাধীদের নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়কের ন্যাম ফলক পরিবর্তনের কথা থাকলেও দেশে শতাধিক স্থাপনা এখনো স্বাধীনতা বিরোধীদের নামে বহাল রয়েছে।
হবিগঞ্জের মাধবপুরে কুখ্যাত রাজাকার ও মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের পিতার নামে প্রতিষ্ঠিত সৈয়দ সাঈদ উদ্দিন ডিগ্রি কলেজের নাম পরিবর্তন করে মৌলানা আছাদ আলী ডিগ্রি কলেজ নাম করণ করলেও কুখ্যাত রাজাকার ও মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের নামে এখনও চলছে একটি সরকারি বিদ্যালয়।
যুদ্ধাপরাধীর সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং তার পিতা সৈয়দ সাঈদ উদ্দিনের নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বহাল থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে সচেতন মহলে। স্বাধীনতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধী রাজাকার সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার ও তার পিতা সৈয়দ সাঈদ উদ্দিনের নামে থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও এলাকার নামকরণ এখনো বহাল থাকায় বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জেলার জনপ্রতিনিধিসহ সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গ।
জানাযায়, স্বাধীনতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধী রাজাকার সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের পিতার নামে প্রতিষ্ঠিত সৈয়দ সাঈদ উদ্দিন ডিগ্রি কলেজের নাম পরিবর্তন করে মৌলানা আছাদ আলী ডিগ্রি কলেজ নাম করণ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু উপজেলার ছাতিয়াইন ইউনিয়নে যুদ্ধাপরাধী রাজাকার সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের নিজ নামে প্রতিষ্ঠিত ছাতিয়াইন সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার রেজিঃবেঃপ্রাথমিক বিদ্যালয়। অপরদিকে যুদ্ধাপরাধী রাজাকার সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের পিতার নামে নোয়াপাড়া সৈয়দ সাঈদ উদ্দিন হাই স্কুল এন্ড কলেজ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। অন্যদিকে আলহাজ্ব এস.এম.ফয়সল রেজিঃ বেঃ প্রাথমিক বিদ্যালয়, মণিপুর সৈয়দ মোহাম্মদ শাহজাহান রেজিঃ বেঃ প্রাথমিক বিদ্যালয় দুটি সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের দুই ভাইয়ের নামে দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
স্বাধীনতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধী রাজাকার ও তাদের পরিবারের নামে কোন স্থাপনা থাকবে না বলে ঘোষণা হলেও মাধবপুরে বহাল তবিয়তে আছে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যুদ্ধাপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত আসামির নামে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নিলেও অদৃশ্য কারণে থমকে আছে।
২০১৬ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্ট দেশের বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানসহ সবস্থাপনা থেকে স্বাধীনতাবিরোধীদের নাম মুছে ফেলার নির্দেশ দিলেও অদ্যাবদি মাধবপুরে যুদ্ধাপরাধীর নামে বা তার পরিবারের নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা নাম পরিবর্তন করা হয়নি। হাইকোর্টের দেওয়া রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন স্থানীয়রাসহ মুক্তিযোদ্ধারা।
১৯৮৭ সালে প্রতিষ্টিত হয় রাজাকার সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের নামে ছাতিয়াইন সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার রেজিঃবেঃপ্রাথমিক বিদ্যালয়টি। ১৯৯১ সালের ১৪ জানুয়ারি সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী বিদ্যালয়টি রেজিস্টার্ড বিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করে। ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের আওতায় সরকারি বিদ্যালয়ের মর্যাদা পায়। ২০১৭ সালে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি বিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তনের দাবিতে সভা করে রেজুলেশন করে উপজেলা শিক্ষা অফিসে দাখিল করা হয়। কিন্তু গত ৬ বছরেও এ বিষয়ে কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত শিক্ষা বিভাগ থেকে পাওয়া যায়নি।
যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির নামে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামকরণ থাকলে তা পরিবর্তন করে ফেলতে হবে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামকরণ ও বিদ্যমান নাম পরিবর্তনবিষয়ক নীতিমালা-২০২৩-প্রকাশ করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
এব্যাপারে মাধবপুর উপজেলা শিক্ষা অফিসার ছিদ্দিকুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, নাম পরিবর্তনের জন্য এটি প্রক্রিয়া রয়েছে। কিছু কাজগপত্র ঝামেলা থাকায় এতদিন হয়নি। তবে গত সপ্তাহে নাম পরিবর্তনের জন্য চিঠি পাঠিয়েছি।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নিজের নামে ‘কায়সার বাহিনী’ গঠন করে হত্যা-গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, আটক, মুক্তিপণ আদায়, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠন করে সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার। এই অপরাধে ২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কায়সারকে সাতটি অভিযোগে প্রাণদণ্ড দেয়। এর মধ্যে ধর্ষণের অপরাধে মৃত্যুদণ্ড; অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতন ও হত্যার চারটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং আরও তিনটি অভিযোগে বিভিন্ন মেয়াদে তাকে ২২ বছরের কারাদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। ২০২২সালের ফেব্রুয়ারীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
সারাদেশে স্বাধীনতাবিরোধীদের নামে শতাধিক স্থাপনা রয়েছে, রয়েছে একাধিক প্রতিষ্ঠান। এসব স্থাপনা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করে মুক্তিযোদ্ধাদের নামে নামকরণ করার দাবী জানান মুক্তিযোদ্ধারা। তিরিশ লাখ কঙ্কালের ওপর দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। আর এই কঙ্কালের ঘাসে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের নামেই স্থাপনা এটি শহীদের রক্তের সঙ্গে বেঈমানি করা। গর্হিত অপরাধ। এগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রশাসন নির্বিকার।
বার্তা প্রেরক
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
০১৯৩১৪৬১৩৬৪
Leave a Reply